The Wicked Coder

PHP, fun and all

পোষ্ট মর্টেম জামাতে ইসলাম : পর্ব-১

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের সূদীর্ঘ ২৪টি বছর মাওলানা আবু আলা মওদুদী ও তার প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী এবং তাঁর অনুসারীরা 
প্রতিনিয়ত বক্ততা,বিবৃতি ও কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে দেশটিকে জাহান্নাম 
বানিয়ে ছেড়েছিল। তাদের উগ্রতা,পাষন্ডতা এবং নির্মমতা আধুনিক সভ্যতার 
সকল সৃজনশীলতাকে ম্লান করে দিয়েছিল সেদিন। ১৯৫৩ সালে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানে ধর্মের নামে হাজার হাজার পাকিস্তানিকে হত্যা,খুন,ধর্ষন ও লুটপাট করে এই দলটি ইতিহাসের জঘন্যতম কালিমা সৃষ্টি করেছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিচারক,বিচারপতি মুনীর ও বিচারপতি কায়ানী এই হত্যাযজ্ঞ,লুন্ঠন,ধর্ষনের পরিকল্পনা ও প্ররোচনাদানের অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মওদুদী কে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছিলেন।কিন্তু ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে এই কুখ্যাত মাওলানা মওদুদীকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। যদি এই ভুলটি আইয়ুব খাঁর মতো স্বৈরশাসকরা না করতেন তাহলে হয়তো ইতিহাসের একই বর্বরতার পুনরাবৃত্তি নাও ঘটতে পারতো।

যেহেতু মাওলানা মওদুদী ইসলামের নামে খুন করেও বেঁচে গিয়েছিলেন,যেহেতু তাঁর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হল না,যেহেতু এই পাপিষ্ঠ তার কৃতকর্মের জন্য কোন প্রকার ভুল বা অনুতাপ প্রকাশ করে নি,সেহেতু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে আবার ১৯৫৩ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটলো। এবারের ঘটনার নায়ক হয়ে আসলেন খুনী মওদুদীর যোগ্য শিষ্য গোলাম আযম। এই আধুনিক খুনীদের একজনের নামের পূর্বে ‘মাওলানা’,আরেকজনের নামের পূর্বে ‘অধ্যাপক’ শব্দজুড়ে অত্যান্ত সুকৌশলে ধর্মের নামে দিনের পর দিন তারা প্রকাশ্যেই হত্যালীলার রাজনীতি চালিয়ে 
আসছেন। 
গোলাম আযম ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর আমীর এবং মওদুদী ছিলেন সমগ্র পাকিস্তানের আমীর। তাঁরা প্রথম থেকেই বলে আসছেন তাঁরা নাকি ‘ইসলামী’আদর্শের রাজনীতি করেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা 
মহান ধর্ম ইসলামের বিবৃতি সাধন করে মওদুদীবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রত।
তৎকালীন পাকিস্তানের হাক্কানী আলেমরা অনেকবার ফতোয়া দিয়ে জামায়াতে ইসলামী মওদুদীবাদীদের কাফের ঘোষণা করেছিলেন। আলেমরা এমনকি এই কথাও বলেছিলেন,মওদুদীবাদী গোলাম আযমের পেছনে নামাজ পড়লে নামাজ হবে না।

পীর মোহসীন উদ্দীন দুদু মিয়া ১৯৬৯ সালে জানিয়েছিলেন,মওদুদীর নামের আগে যে ‘মাওলানা’ শব্দটি ব্যবহার করেন তা সনদপ্রাপ্ত ‘মাওলানা’ খেতাব নয়। তিনি বলেন,ভারতের হাইদরাবাদের নিজামের দরবারে মওদুদী প্রভুদের তুষ্ট করার জন্য মওদুদী নানা রকম দালালির কাজকর্ম করতেন। সেখানে তিনি নিয়মিত সুট এবং টাই পরতেন। পরে অনৈসলামিক কাজে নিয়ত সাম্রাজ্যবাদী ওই প্রভুরা মওদুদীকে ‘মাওলানা’ খেতাব দেন। (দৈনিক পাকিস্তান,২০ অক্টোবর,১৯৬৯।)

এছাড়া রাজতন্ত্রের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা তা আবার ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে প্রমান করার জন্য তিনি হাইদরাবাদের নিজামুলমুলক আসিফ জাহর জীবন-চরিতও রচনা করেছিলেন। (বর্তমানে সৌদি রাজতন্ত্রের সাথে জামায়াতে ইসলামীর সখ্যতার কারণও এখানেই নিবন্ধ)। (হালিম দাদ খান,মুক্তিযুদ্ধ ও গোলাম আযম(ঢাকাঃ১৯৯২)পৃষ্ঠা ৯)

১৯৬৯ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের শ্রদ্ধেয় আলেম মাওলানা অলিউর রহমান, জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ডে দেশের মানুষ ইসলাম সম্পর্কে ভুল বুঝতে পারে আশংকা করে বিবৃতি দিয়েছিলেন। (দৈনিক পাকিস্তান,৭ নভেম্বর ১৯৬৯।)

১৯৭০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার নিখিল পাকিস্তান ইসলামী বিপ্লবী পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দুল্লহ বিন সাইদ জামায়াতে ইসলামী সমর্থক ইমামের পেছনে নামাজ না পড়ার আবেদন জানিয়েছিলেন। (দৈনিক পাকিস্তান,১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭০।)

৬৯ সালের ৩০ অক্টোবর পাকিস্তানের ১৩ জন আলেম জামায়াতে ইসলামী সমর্থকদের কাফের ঘোষনা করে ফতোয়া দিয়েছিলেন। (দৈনিক পাকিস্তান,৩০ অক্টোবর ১৯৬৯।)

পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি জামে মসজিদের ইমাম ১৯৬৯ সালে জানিয়েছিলেন, মাওলানা মওদুদী কোরআনের অপব্যাখ্যা করে বই লিখে প্রচার করে ধর্মপ্রান মুসলমানদের ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। তিনি দাবি করেন,মওদুদী তার বইগুলো প্রত্যাহার করবেন বলে ওয়াদা দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি ওয়াদা খেলাপকারী মোনাফেকের পরিচয় দিয়েছিলেন। (দৈনিক পাকিস্তান,২২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯।)

এখানে বলাবাহুল্য,পবিত্র ইসলাম ও কোরআনের অপব্যাখ্যা করা এই বইগুলোই বর্তমান বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী এবং তার শিরোমণি গোলাম আযম, আব্বাস আলী খান,মওদুদীবাদ যা উগ্রধর্মান্ধ ও ক্ষমতার লিপ্সা থেকে জাত, যা আধ্যাত্মিকতা নয়,প্রচণ্ড ভোগ-বিলাস ও মোহ সৃষ্টির প্রয়োজনে সৃষ্ট।

সারা দুনিয়ার মানুষ ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবেই জানে। এই ধর্মের প্রচারক হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) দ্বারে দ্বারে গিয়ে দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষকে সৎ ও ন্যায়ের পথে এনেছিলেন। এই জন্যে রসুলকে সীমাহীন নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
কিন্তু গোলাম আযমের গুরু মওদুদী হযরত রসুলে আকরামের এই আত্মত্যাগকে অপমানিত করছেন কোন প্রকার কৌশলে নয়,একেবারে প্রকাশ্য কৌশলে। মওদুদী তাঁর ‘আল জেহাদ কিল ইসলাম’ গ্রন্থে’ লিখেছেন ;
‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহে ওয়াসাল্লাম তের বছর পর্যন্ত আরবকে ইসলামের আহ্বান জানাতে থাকেন,মানুষকে বুঝানোর যত প্রকার উৎকৃষ্ট পন্থা আছে তা অবলম্বন করেন,যুক্তি-প্রমান দেন….তিনি সত্য প্রকাশ ও সংস্থাপনের জন্য উপযোগী কোন উপায় বাদ দেয় নাই।… কিন্তু ওয়াজ নসিয়ত ব্যর্থ হওয়ার পর ইসলামের আহ্বায়ক তলোয়ার হাতে লইলেন…তিনি (সঃ)তলোয়ার হাতে লওয়ার পর মানুষের মন থেকে ক্রমে ক্রমে পাপ ও দুস্ক্কৃতির কালিমা দূর হতে লাগলো।’ (মওলানা আবু আলা মওদুদী,আল জেহাদ কিল ইসলাম,পৃষ্ঠা ১৩৭-১৩৮(হযরত মিয়া তাহের আহমদ (আইঃ),পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্রের উত্তর, দ্বিতীয় খণ্ড (ঢাকা,১৯৮৭) প্রশ্নে উদ্ধৃত।)

দুনিয়ার বুকে ইসলাম প্রচারিত হওয়ার এই তত্ব হচ্ছে অমুসলমানদের। ইসলামবিরোধীরা সব সময় প্রচার করে এসেছে যে,ইসলাম দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত 
হয়েছে গায়ের জোরে তলোয়ার দিয়ে। মওদুদীর এই ব্যাখ্যায় শুধু ইসলামের 
দুশমনরাই খুশি হতে পারে,মুসলমানেরা নয়। 
শুধু তা-ই নয়,মওদুদী চ্যালেঞ্জ করেছেন পরম শক্তিমান আল্লাহ তায়ালার প্রতিও,অপমান করেছেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদকেও(নাউজিবিল্লাহ!)। এছাড়া ইসলামের সুবিখ্যাত সাম্য ও কেন্দ্রীয় আদর্শের আকর্ষণের কথাও এতে অস্বীকার করা হয়েছে।এমনি করে এই জামায়াতে ইসলামী এবং গোলাম আযমরা সুকৌশলে এদেশে ইসলামের মূল প্রেরনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। 

১৯৬৯-৭০ সালে যখন এদেশের আপামর মানুষ তাদের প্রিয় রাজনৈতিক নেতা হিসাবে শ্লোগান তুলেছিলেন,‘আমার নেতা-তোমার নেতা : শেখ মুজিব-শেখ মুজিব’ তখন জামায়াতে ইসলামী পাল্টা আমাদের প্রিয় নবীকে শেখ মুজিবের প্রতিপক্ষ দাঁড় করিয়ে 
বলল,‘আমার নেতা-তোমার নেতা : বিশ্ব নবী মোস্তফা।’ জামায়াতে ইসলামীরা 
জানতো,এদেশের মানুষ বাংলাদেশের নেতা হিসেবেই শেখ মুজিবের শ্লোগান 
দিচ্ছে। তারপরেও প্রিয় নবীর নামে পাল্টা শ্লোগান তুলে তারা বলেছিল,আমাদের নেতা হযরত মোহম্মদকে মানলে পাল্লায় ভোট দাও। কিন্তু বাংলার মানুষ ভোট দিল শেখ মুজিবের নৌকায়। তাহলে অর্থটা কি দাঁড়ায়,ভোটে কি শেখ মুজিবের কাছে হযরত মোহম্মদ(সঃ)-এর পরাজয় ঘটলো(নাউজিবিল্লাহ)! 

এভাবেই পলেপলে দিনে দিনে জামায়াত আমাদের ধর্ম ,আমাদের ইসলামকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

পৃথিবীর সকল দেশেই যার যার রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড,জাতিসত্তা,ইতিহাস,ঐতিহ্য,আইনবিধি নিয়ে আলাদা সংবিধান থাকে। পৃথিবীর সকল দেশেই তা আছে,শুধু তাই নয়,সকল মুসলিম দেশেও আছে। কিন্তু বুঝেশুনেই জামায়াত চটকদার শ্লোগান দেয়,‘আমাদের সংবিধান কোরআন’। 
প্রকৃতপক্ষে কোরআনকে কে অস্বীকার করছে ? কেউ না। তবুও জামায়াত একটি 
দেশের সংবিধানের প্রতিপক্ষ হিসেবে কোরআনকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। খুব 
সচেতনভাবে পবিত্র গ্রন্থ কোরআনকে তারা এভাবে অপমানিত করছে।

প্রিয় নবী হযরত মোহম্মদ(সঃ)-এর সময়ে তার নেতৃত্বে বদরের যুদ্ধ হয়েছিল। সেই পবিত্র ধর্মীয় যুদ্ধে যেসব বীর অংশ নিয়েছিলেন তারা ইসলামের ইতিহাসে আলবদর নামে খ্যাতি লাভ করেছিল। গোলাম আযমরা ১৯৭১ সালে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সময় এই নামেই একটি খুনী বাহিনী তৈরি করলো। মহান আল্লাহ সেদিন তাদের অবশ্যই শায়েস্তা করেছিল,তাদের ধ্বংস করেছিল,সমূলে এদেশ থেকে উৎপাটন করেছিল। কিন্তু একটি ক্ষত থেকেই গেল, মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যাকারী, আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণকারী এই বাহিনীকে এখন বাংলার মানুষ রাজাকার-আলবদর বলে গাল দেয়। পবিত্র ‘আলবদর’ শব্দটির এই অপব্যবহারের ফলে মহান ইসলামের এক বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। 

পৃথিবীর সব দেশের গনতান্ত্রিক সমাজ বলে থাকে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। 
চীনের মাও সে তুং অবশ্য বলতেন,বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস। তার বিপরীতে এই রাজনৈতিক বাক্যটি ব্যবহার হত। ইদানিং জামায়াতে ইসলামী ও গোলাম আযমরা সারাদেশে একটি শ্লোগান দেয়ালের গাঁয়ে সেঁটে দিচ্ছে : ‘আল্লাহই সকল ক্ষমতার উৎস’। এই শ্লোগানটি নতুন করে তুলে গোলাম আযমরা আসলে কি বলতে চায় : একটি হচ্ছে,তারা জনগনকে ভয় পায়,জনগনের রায়কে ভয় করে,তারা জানে যতোই ইসলাম,আল্লাহ,কোরআন,নবী ইত্যাদি নিয়ে তারা রাজনৈতিক ব্যবসা করুক না 
কেন,জনগণ সময়ে এসে ঠিকই তাদের ঝাড়ু-পেটা নয় শুধু, এবার একেবারে নির্মূল 
করে ছাড়বে। কারণ আমাদের মহান আল্লাহ অবশ্যই সকল ক্ষমতার উৎস। এ 
ব্যাপারে কারো শুধু নিরংকুশ নয়,বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকলে সে আর মুসলমান থাকতে পারে না। কিন্তু ‘জনগন সকল ক্ষমতার উৎস’ কথাটি আসছে একটা দৈশিক প্রশ্নে, এরশাদের মতো অবার্চীনরা মনে করে রাইফেল একটা উচিয়ে ধরতে পারলেই ক্ষমতাই যাওয়া যায়,‘ জনগন ক্ষমতার উৎস’ বলতে এই বন্দুকওয়ালাদেরকেই চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে,জামায়াতী-গোলামরা তা জানেও। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালাকে তারা সজ্ঞানে হেয় করতে চায় বলেই এই ‘আল্লাহ ক্ষমতার উৎস’ শ্লোগানটি পাল্টা সামনে তুলে দিচ্ছে।

জামায়াতী-গোলাম আযমরা যুগে যুগে যে মার খেয়েছে, ধ্বংস হয়েছে এই কারনেই। পবিত্র ধর্ম ,আল্লাহ এবং আমাদের প্রিয় নবীকে নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা করার কারণেই আজ সমাজে তারা উচ্ছিষ্ট,তারা নরাধম,অসভ্য,বর্বর বলে পরিচিত। এই জন্যেই বাংলার পবিত্র ভূমিতে তাদের জায়গা নেই বলে ধ্বনি ওঠে। শুধু বাংলা কেন,এই পৃথিবীর কোন দেশই এই গণ্ডমূর্খ, জ্ঞানপাপী, রাফেজী ধর্মদ্রোহী বাতিল মতবাদীদের আজকে গ্রহন করতে রাজি হচ্ছে না। এদের প্রতি আল্লাহর গজব ও অভিশাপ নাজিল হয়েছে। ১৯৫৩ সালে এদের আমীর মওদুদীর ফাঁসি হয়েছিল,সেই রায় কার্যকর না
করাতে এদেশের জনগন ১৯৭১ সালে এদের পাপের ফলকে ভোগ করেছে। আবার ১৯৭১ সালে এদের পাপের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়াতে আজকে আবার এইসব ‘বাতেল 
মতবাদে’র লাঞ্ছনা জনগনকে ভোগ করতে হবে। যেহেতু জনগন তার মনোবাঞ্ছা 
পূরণে দেরিতে হলেও গোলাম আজমের ফাঁসি দিতে প্রস্তুত এবং পবিত্র দায়িত্ব পালনে যারাই পিছপা হবেন,আল্লাহ তাদেরও শাস্তি দিতে ভুলবেন না।আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) তাঁর বিদায় হজের শেষ ভাষণে বলেছিলেন,ধর্ম নিয়ে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না,অতীতে অনেক জাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই সেদিনই তো আমরা দেখলাম,কথায় কথায় পাকিস্তানে ধর্মের নামে হোলিখেলার রাজনীতি। এই বর্বর ধর্ম ব্যবসায়ীদের জন্য পৃথিবীর সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশ ‘পাকিস্তান’ টিকতে পারলো না,ধ্বংস হয়ে গেল। 

আজও দেখতে পাচ্ছি,আমাদের দেশের এক শ্রেনীর মাওলানা সেই পূর্বের মতোই আবারও ধর্মের নামে ডিগবাজি খাচ্ছেন,মনের খুশিতে যা ইচ্ছা বলছেন, যা 
ইচ্ছা ফতোয়া দিচ্ছেন,ইসলামের নামে লড়াই করতে চাচ্ছেন। তাদের জন্য এক
প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় অপেক্ষা করছে,সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে,উড়ে যাবে এইসব জোশ, আলেম হিসেবে তারা কখনোই তখন আর বিবেচিত হবেন না। কারন তাঁরা 
রাজনীতির মাঠে নেমেছেন,তাঁরা রাজনৈতিক নেতার মর্যাদা হিসেবেই আল্লাহর ইচ্ছায় সীমা লঙঘনের দায়ে জনগন কর্তৃক হেদায়িত হবেন।

এখানে বলে নেওয়া ভাল, আমাদের দেশের হাক্কানী আলেমরা কখনই তাদের সাথে ছিলেন না,তাঁরা এই নোংরা রাজনীতিতে কখনই আসেন না। আমাদের দেশের 
মাদ্রাসার ছাত্র এবং আলেম সমাজ বেশির ভাগ ‘দেওবন্দী’ আলেম সমাজের 
অনুসারী। এরা কখনই জামায়াতে ইসলামীর মওদুদীবাদকে সমর্থন করেন নি, বরং 
জামায়াতদের তারা কাফেরই মনে করে থাকেন। এছাড়া,আমাদের দেশের আরেকটি 
দাওয়াতী প্রতিষ্ঠান আছে, ‘তবলীগ জামাত’ যার নাম,তারাও কখনই ধর্মের সাথে 
রাজনীতিকে মেলাতে আসেন নি । অনেক সচেতন রাজনৈতিক কর্মীই তাদের সম্বন্ধে ভুল বুঝে থাকেন। জামায়াতী ইসলামী গোলাম আযমরা আজ মনেপ্রানে এদেরই প্রধান শত্রু বলে বিবেচনা করে থাকে। কারন জামায়াতে ইসলামী ও গোলাম আযমদের মওদুদীবাদী আদর্শকে তাত্ত্বিকভাবে এরাই সবসময় প্রত্যাখ্যান করে আসছে। প্রকতপক্ষে এরাই আসল ইসলামিক মৌলবাদী।

জামায়াতে ইসলামীকে আজ যারা ‘মৌলবাদ’ বলছেন তাঁরা আসলে ভূল করছেন।
কারণ জামায়াতে ইসলামী ও তার নেতা-কর্মীরা সেই গোলাম আযম, মাওলানা সাঈদী যেই হোন,তারা কেউ ইসলামের মূলকে ধরে রয় নি,বরং ইসলামের বিকৃতি সাধন করে 
তারা এখন তথাকথিত আধুনিক ইসলাম করার চেষ্টা করছেন,যা রসুলের ইসলামের সাথে কোন মিল নেই। মাওলানা সাঈদী,গোলাম আযমরা এখন অডিও-ভিডিও, নাচ,গান, বাদ্য,চার রঙা ছবির আত্মজীবনীর বই সবই করে চলেছেন।জামায়াতে ইসলামী এবং গোলাম আযম-মাওলানা সাঈদীদের সবচেয়ে বড় অধঃপতন দেখতে পাই তাদের মিথ্যাচারে। তাদের প্রচারিত দৈনিক সংগ্রাম,মিল্লাত প্রভৃতি দৈনিকগুলোকে দিনের পর দিন মিথ্যা এবং জ্বলন- মিথ্যাগুলো জেনেশুনে প্রচার করতে দেখা যায়। তা যেকোনো সুসভ্য মানুষকে বিচলিত করবে। প্রতিদিন সংবাদ আর মিল্লাত পড়লে মনে হবে দেশে বুঝি এখন কোন যুদ্ধ চলছে। তাদের অবিরাম মিথ্যার বেসাতি এবং অসহনীয় উস্কানির ফলে দেশে যদি কোনো প্রলয়ংকরী ঘটনা ঘটে যায় তাহলে পরবর্তীকালে এগুলোই হবে দলিল,যেকোনো সুসভ্য মানুষ পড়লে বুঝতে পারবে এইসব পাপিষ্ঠ অমানুষের দল কেমন করে ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে এনেছিল ১৯৭১ সালের মতোই।

জামায়াতে ইসলামী ও গোলাম আযমের মিথ্যাচারের কতকগুলো নমুনা এই প্রসংগে উল্লেখ করা যায়। প্রথমেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসা হওয়া উচিত তথাকথিত ‘ভাষা সৈনিক’ হিসেবে গোলাম আযমের দাবি।
প্রকৃতপক্ষে ভাষা আন্দলন বলতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মদানকেই বোঝানো হয়ে থাকে। ভাষার সংগ্রাম হিসেবে এদিনটিকেই বাংগালি জাতি প্রতিবছর স্মরণ করে থাকে। বর্তমানের ভাষা শহীদ মিনার ’৫২সালের এই দিনটির স্মৃতি সামনে রেখেই।
গোলাম আযম ১৯৫২ সালে ছাত্র ছিলেন না,রাজনৈতিক নেতাও ছিলেন না। গোলাম আযমের নির্দেশে তাঁরই অনুগামী শিষ্য আলবদর নেতা মুহাম্মদ কামরুজ্জামান গোলাম আযমের যে জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন তাতে দাবি করেছেন যে,১৯৪৮ সালে চকবাজারে গোলাম আযম অন্যদের সাথে প্রচারপত্র বিলি করতে গিয়েছিলেন। আরও একটি তথ্য দিতে গিয়ে এই গ্রন্থেই বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান যখন ঢাকায় এসেছিলেন, তখন ডাকসুর পক্ষ থেকে একটি মানপত্র পড়া হয়েছিল এবং তা ডাকসুর সহ-সভাপতি অরবিন্দ বোস পড়বেন বলে ঠিক হলেও হিন্দু বলে তিনি পড়েন নি,পড়েছেন সাধারণ সম্পাদক গোলাম আযম। ব্যস্‌,এই তো বীর! আজ ভাষা আন্দোলন যখন বাঙাগালির হৃদয়ে এমন প্রাণবিদ্ধ হয়ে আছে,কোন রকম তার সাথে কৃতিত্ব নিয়ে ভাষা সৈনিক খেতাব নিতে পারলেই বাংগালির হৃদয়ে স্থান পাওয়া সম্ভব হবে।
কিন্তু সম্ভব নয়। কারণ প্রথমেই বলেছি,ভাষা সৈনিক বলতে এদেশের মানুষ ’৫২ সালের একুশের মিছিলের সৈনিকদের বুঝে থাকেন। গোলাম আযম ১৯৪৮ সালে ভাষার লড়াইয়ের এই তথাকথিত সংযোগের দাবী ধোপে টেকে না। কারণ ১৯৪৮ 
কেন,এরকম বাংলা ভাষার দাবির সমর্থনে ছোটখাট সূত্রপাত ১৯৫৭,এমনকি’৪৭-পূর্ববর্তী সময়েও ঘটেছে। বরং ১৯৪৮ সালে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ভাষার সংগ্রামে গোলাম আযম ছিলেন নীরব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে 
সেদিন বাংলা ভাষার পক্ষে একটি বিবৃতিও তিনি দেন নি। দালাল ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি সেদিন ছিলেন নীরব। সেদিনের আন্দলনের পক্ষে তিনি তাঁর একটি বিবৃতির প্রমানও দেখাতে পারবেন না। ভাবতে লজ্জা হয়,সেদিনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যেসময় জিন্নাহর মুখের উপর ‘না-না’ করে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছিলেন,গোলাম আযম তখন গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। বরং গোলাম আযম নিজেই ঐ গ্রন্থেই স্বীকার করেছেন,জিন্নাহ সম্মানে রেসকোর্সের সংবর্ধনায় তিনি নাকি ‘মঞ্চের কাছেই বসেছিলেন’ এবং সেদিন জিন্নাহ উর্দূর পক্ষে কথা বললে তিনি নাকি কোন প্রতিবাদ দেখেন নি। 
(মুহাম্মদ কামরুজ্জামান,অধ্যাপক গোলাম আযমের সংগ্রামী জীবন,ঢাকা, ১৯৮৯, 
পৃষ্ঠা ২৭-২৮।)

এর চেয়ে নির্লজ্জ মিথ্যা আর কি হতে পারে! প্রকৃতপক্ষে সেদিনও গোলাম আজমের ভূমিকা ছিল সুস্পষ্টভাবে উর্দূরই পক্ষে। ফলে জিন্নাহর সাথে যখন ছাত্র নেতারা দেখা করতে গিয়েছিলেন, এবং বাংলার পক্ষে দাবি জানিয়েছিলেন তখন সেই প্রতিনিধিদলে গোলাম আযম কেন স্থান পান নাই। তার সেদিনের একই গনবিরোধী ভূমিকার জন্যই ডাকসুর মতো প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরও কোন জায়গায় তাঁর প্রতিনিধিত্ব নেই। তিনি বাংলার দাবিতে কোথাও যান নি। কোন দলিলে তাঁর নাম পাওয়া যায় না। গোলাম আযম বাঙালি সন্তান হয়েও আজীবনই যে পাঞ্জাবী প্রভুদের ‘দাস’ ছিলেন তার প্রমান রয়েছে তাঁর প্রমাণ রয়েছে তাঁর কর্মকাণ্ডেই। ১৯৭০ সালের ১১ এপ্রিল রাজশাহীতে গোলাম আযম বলেছিলেন,‘বাঙালিরা কখোন জাতি ছিল না’। (দৈনিক পাকিস্তান, ১৩ এপ্রিল, ১৯৭০।)

একই বছর ১৮ জুন তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের শুক্কুরে তাঁর পাঞ্জাবি প্রভুদের দেওয়া এক সংবর্ধনার জবাবে বলেন, বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি তাতে অংশ নিয়েছিলেন কিন্তু এই জন্য তিনি অনুতপ্ত। তিনি আরো বলেন, এদেশের মুসলমানদের ভাষা হওয়া উচিত উর্দূ। (দৈনিক পাকিস্তান, ১৯ জুন, ১৯৭০।)

গোলাম আযম ডাকসুর একজন নেতা হয়েও ’৪৮সলে চকবাজারে একটি সামান্য 
প্রচারপত্র বিলি করার কৃতিত্ব নিয়েই ভাষা আন্দোলনের অংশগ্রহনের খেতাব নিতে চাচ্ছেন,অথচ বাংলা ভাষার পক্ষে ডাকসুর নেতা হিসেবে একটি বিবৃতি সেদিন তিনি কুন্ঠাবোধ করেছিলেন। আর তিনিই সেই অংশগ্রহনের দাবিদার না হয়েও বলছেন ,ভুল করেছিলেন। আজকে আবার তাঁর যখন বিচারের সম্মুখিন হবার সম্ভাবনা হচ্ছে,তখন আবার বলছেন,তিনি ‘ভাষা সৈনিক’ ছিলেন।
ভাবতে অবাক লাগে যে,এদের মতো পাপাচারী-মিথ্যাবাদী এবং ভণ্ড প্রতারক ‌ কোন কালে কি হতে পারে! পৃথিবীতে এই চিড়িয়ার আর একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ!

Updated: October 3, 2014 — 6:26 pm
The Wicked Coder © 2014